বাংলাদেশ আজ এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করছে যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি এবং পরিবেশগত অবক্ষয় আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের অবকাঠামো, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও নগর অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ফলে পরিবেশ খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয় বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঝুঁকি হ্রাসের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এবারের বাজেটে বনায়ন কর্মসূচির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, গাছ রোপণের সংখ্যা প্রায়ই সাফল্যের সূচক হিসেবে উপস্থাপিত হলেও গাছের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার হার পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। তাই বনায়ন কর্মসূচির জন্য “Plantation to Survival” পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি। প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার জন্য নির্দিষ্ট Tree Canopy Coverage Target নির্ধারণ, দেশীয় প্রজাতির গাছ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় Urban Forestry-কে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে নীতিগত সংস্কার অপরিহার্য। বাংলাদেশে এখনো উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই সঙ্গে প্লাস্টিক উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে Extended Producer Responsibility (EPR) কাঠামো বাস্তবায়ন প্রয়োজন। শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, বরং একটি চক্রাকার অর্থনীতি (Circular Economy) গড়ে তোলাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
বায়ুদূষণ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুতর পরিবেশগত সংকটগুলোর একটি। ঢাকার বায়ুদূষণ এখন জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বোঝা তৈরি করছে। নতুন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন অবশ্যই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ; তবে মনিটরিংয়ের পাশাপাশি উৎসভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জরুরি। ইটভাটা, নির্মাণকাজ এবং পরিবহন খাতকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত Air Quality Management Framework প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বায়ুর মান সংক্রান্ত তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দূষণ নিয়ন্ত্রণে অধিক ক্ষমতা ও সম্পদ প্রদান করাও জরুরি।
পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বৈদ্যুতিক যানবাহনের সফলতা কেবল যানবাহন আমদানির ওপর নির্ভর করে না; বরং চার্জিং অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই একটি জাতীয় E-Mobility Roadmap প্রণয়ন করা সময়ের দাবি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর-সুবিধা প্রদান বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে। তবে বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (Rooftop Solar) সম্প্রসারণ, সরকারি ভবনে বাধ্যতামূলক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং শিল্পখাতে সবুজ জ্বালানি অর্থায়নের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করলে আরও বেশি ফল পাওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবেশ খাতে বরাদ্দের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য ফলাফলভিত্তিক সূচক (Outcome-Based Indicators) প্রবর্তন করা। কত টাকা ব্যয় হলো, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যয়ের ফলে কী পরিবর্তন ঘটলো। বায়ুদূষণ কত শতাংশ কমলো, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের হার কত বাড়লো, নগর সবুজায়ন কতটা বিস্তৃত হলো কিংবা কত মানুষ জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর সুবিধা পেল সেসব সূচকের ভিত্তিতেই প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং জলবায়ু অভিযোজনের এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। এবারের বাজেট পরিবেশগত অগ্রাধিকারের একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং স্বচ্ছ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অঙ্গীকারকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা। কারণ টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত সুরক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারি তার ওপর।
লেখক: নগর পরিবেশবিদ আবু জোবায়ের