আবাসন নিউজ ডেস্ক :
বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে গাছের চারা তুলে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ।
গতকাল রোববার ঢাকায় আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে
শুধু সনদ নয়, দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষায় জোর প্রধানমন্ত্রীর
সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে শুধু একাডেমিক সনদ অর্জন যথেষ্ট নয়; কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা এমন হতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের শুধু সনদ নয়, কর্মদক্ষতা ও বাস্তব জীবনের সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করবে।
একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানকে সম্মান জানাতে হলে নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে এগিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দুই হাজারের বেশি অধিভুক্ত কলেজে বর্তমানে ৪০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
শিক্ষাক্রমে যুক্ত হবে আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটোমেশন ও এআইনির্ভর প্রযুক্তির কারণে অনেক প্রচলিত পেশা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়লেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এ বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানো প্রযুক্তি, ফাইভ-জি প্রযুক্তি, মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ফরেনসিক বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
বেকারত্ব কমাতে ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ কার্যক্রম
উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। এ কারণে সরকার ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ (এপ্রেন্টিসশিপ) কার্যক্রম এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
নৈতিক শিক্ষা ও তৃতীয় ভাষা শেখার আহ্বান
প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে নৈতিকতার বিকল্প
নেই। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কেও
সচেতন হতে হবে।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি অন্তত একটি তৃতীয় ভাষা শেখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এতে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে।
নতুন শিক্ষা কাঠামোর রূপরেখা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করতে একটি নতুন শিক্ষা কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলছে।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী একাডেমিক শিক্ষা থাকবে ৪০ শতাংশ, প্র্যাকটিক্যাল ও পেশাগত দক্ষতা ৩০ শতাংশ, ইন্টার্নশিপ ২০ শতাংশ, ফিল্ডওয়ার্ক, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ১০ শতাংশ।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং সুনাগরিক তৈরির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি জানান, এ লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার সেন্টার, জব প্লেসমেন্ট সেল, ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা, শিক্ষানবিশ ও ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ
অনুষ্ঠানে ‘কর্মমুখী শিক্ষা নেব, বিশ্বজুড়ে কাজ করব’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন পাঠ্যক্রমে ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং ও ডেটা সায়েন্স বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এসব বিষয়ে পাঠদান নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে ৯০০ মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দেশের ১২ হাজার কলেজ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সম্মাননা স্মারক ও গাছের চারা উপহার দেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্ম ও জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানসহ শিক্ষা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।