নগরায়ণের হার বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম। নগরায়নের দিক থেকে ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম শহর, যা ২০০০ সালে ৯ম অবস্থানে ছিল। তাই ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালে এটি বিশ্বের ১ম বৃহত্তম শহরে পরিণত হতে পারে। কিন্তু ঢাকা শহরে এই দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সমান তালে বাড়ছেনা পরিকল্পিত অবকাঠামো, প্রশাসনিক সমন্বয় বা নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা। ফলে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। দেশের বাসযোগ্যতা সংকট নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার সিংহভাগই বিক্ষিপ্তভাবে একেকটি সমস্যাকে নির্দেশ করে- যেমন পরিবেশ, যোগাযোগ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ঝুঁকি ও সামাজিক নিরাপত্তা। কিন্ত সত্যিকার অর্থে এই সবগুলো একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)
১৮ আগস্ট ২০২৬, বিআইপি কনফারেন্স হলরুমে সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন
উল্লিখিত সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করলে যে বিষয়গুলো সামনে আসে, তা হলো-
১. পরিবেশগত সমস্যা
১.১ বায়ুদূষণ
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান IQAir-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল (১৭ আগস্ট, ২০২৬) বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ১৮তম। এবং ঢাকার বায়ুমান সূচক (Air Quality Index or AQI) স্কোর ছিলো ৭৯, যা ‘মাঝারি’ মানের বায়ু হিসেবে বিবেচিত। IQAir-এর গবেষকদের হিসাব বলছে, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রায় ৮৫% মাত্র তিনটি প্রধান উৎস থেকে আসে যেমন ইটভাটা, রাস্তার ধুলা ও বালি এবং যানবাহনের নির্গমন। ঢাকার আশপাশে প্রায় ২,০০০টি প্রচলিত ইটভাটা রয়েছে। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা সংস্থা Centre for Research on Energy and Clean Air (CREA)-এর একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে, বায়ুদূষণজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রাণ হারায় আনুমানিক এক লাখেরও বেশি মানুষ।
১.২ জলাবদ্ধতা
একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৬ সালের বর্ষা মৌসুমের আগে কর্তৃপক্ষ ঢাকায় জলাবদ্ধতাপ্রবণ ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১০৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৩৩টি স্থান রয়েছে। নগর গবেষক খন্দকার গোলাম তাওহিদ তার একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে মূল কারণ বৃষ্টি নয়, বরং আমাদের অপরিকল্পিত ও ব্যর্থ নগরায়ণ। তার গবেষণা অনুযায়ী, এক সময় ঢাকায় প্রায় ৫৬ টি খাল ছিল, যেগুলো শহরের প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করতো। আজ তার মধ্যে ২৬ টি খালের কোনো অস্তিত্বই নেই। এই দাবিকে আরও জোরালো সমর্থন দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)-এর একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ, যেখানে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক ভূমি জরিপ এবং ২০২২ সালের স্যাটেলাইট চিত্র পাশাপাশি রেখে দেখানো হয়েছে যে, বিগত ৮ দশকেরও বেশি সময়ে ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে-কোনোটি সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে, কোনোটি দখলের চাপে সংকুচিত হয়ে, আবার কোনোটি বক্স কালভার্টের নিচে চাপা পড়ে। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-২০১৯ সাল-এই ৯ বছরেই ঢাকা হারিয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার একর বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল, জলাধার ও জলাশয়। এবং রাজউকের অধিক্ষেত্রে থাকা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পুকুরের মধ্যে মাত্র ২২৫ টি টিকে আছে মধ্য ঢাকা অঞ্চলে। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের (আইডব্লিউএফএম) অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, একটি নগরের মোট আয়তনের অন্তত ১২ শতাংশ জলাধার হিসেবে সংরক্ষিত থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকায় তা এখন ২ শতাংশেরও কম। ঢাকা শহরে বিদ্যমান ড্রেনেজ চ্যানেলগুলো তৈরি হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে, কোনো বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া। পানি কোথা থেকে আসছে, কোন পথে যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে মিলিত হচ্ছে-এই আন্তঃসংযোগের সুস্পষ্ট চিত্র বা পরিকল্পনা আমাদের হাতে নেই। খন্দকার গোলাম তাওহিদের ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগীই নিষ্কাশনব্যবস্থার দুর্বল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণকে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। খাল, জলাশয় ও রিটেনশন পন্ডের জন্য চিহ্নিত অধিকাংশ জায়গা এখন ভরাট, দূষিত বা সংকুচিত। এছাড়াও, নগরের ভূপ্রকৃতিগত বৈচিত্র্য ও তার প্রতি অমনোযোগ জলাবদ্ধতার একটি অন্য কারন। ঢাকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২-১৩ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করে, আর ঢাকা ওয়াসা শহরের অন্তত ৪৮ টি এলাকাকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মিরপুরের কাজীপাড়া-সেনপাড়া, বাসাবো, খিলগাঁও, বাড্ডা, পোস্তগোলা, ডেমরার মতো নিচু এলাকাগুলোতে উঁচু এলাকা থেকে পানি নেমে আসে, কিন্তু সেই পানি ধরে রাখা বা নিষ্কাশনের কোনো পর্যাপ্ত জলাধার সেখানে নেই। ফলে ৩-৪ দিন ধরে পানি জমে থাকাটাই এসব এলাকায় স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১.৩ শব্দদূষণ
আইন অনুযায়ী নীরব এলাকায় শব্দমাত্রা ৫০ ডেসিবেলের মধ্যে থাকার কথা, আবাসিক এলাকায় ৫৫ ও বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবেল (dBA) । বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকার হাসপাতাল, আবাসিক, মিশ্র, নীরব, বাণিজ্যিক ও শিল্প-প্রায় সব ধরনের ভূমি ব্যবহার (Land Use) এলাকাতেই শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মান অতিক্রম করছে। এমনকি হাসপাতালগুলোর সামনে গড় শব্দমাত্রা ৮১.৭ ডেসিবেল রেকর্ড হয়েছে। যা নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও বাসযোগ্যতার জন্য গুরুতর হুমকিস্বরূপ। চুয়েট এর পুরকৌশল বিভাগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বাসিন্দারা গড়ে ৭৫ ডেসিবেল (dBA) মাত্রার শব্দের মধ্যে বসবাস করছেন, যা বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে বেশি। এছাড়াও, সেখানে ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৩টি ওয়ার্ডে শব্দমাত্রা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। একটি সংবাদ মাধ্যমে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও এর বাস্তবায়ন এখনও দুর্বল।
১.৪ দৃশ্যদূষণ (Visual Pollution)
বিলবোর্ড, পোস্টার ও ব্যানারে শহরের রাস্তাঘাট, ভবনের দেয়াল, এমনকি বিদ্যুতের খুঁটিও ছেয়ে থাকে। এই দৃশ্যদূষণ শুধু নান্দনিক সমস্যা নয়। অতিরিক্ত সাইনবোর্ড চালকের দৃষ্টি ব্যাহত করে বলে সড়ক দুর্ঘটনার একটি কারণ। সিটি করপোরেশনগুলোর বিজ্ঞাপন নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ অভিযান মূলত সাময়িক ও অনিয়মিত থেকে যায়। পরিবেশ বিজ্ঞানী ও UNFCCC-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ড. শাহরিয়ার হোসেন উল্লেখ করেছেন যে, দৃশ্যদূষণ বাংলাদেশের শহরগুলোতে জনস্বাস্থ্য, সড়ক নিরাপত্তা ও বাসযোগ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ, যার মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা। তাই তিনি কার্যকর নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহারভিত্তিক জোনিং এবং বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন।
১.৫ জনস্বাস্থ্য সমস্যাঃ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুল কাদের মহিউদ্দিন এর ২০২৬ সালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ৩,২১,০০০-এর বেশি ডেঙ্গু সংক্রমণ ও ১,৭০৫ জনের মৃত্যু রেকর্ড হয় এবং ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৯৪,৩০০-এর বেশি সংক্রমণ ও ৩৮২টি মৃত্যু ঘটে। উক্ত গবেষণায় আরও নির্দেশ করে যে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, উচ্চ জনঘনত্ব, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, জলাবদ্ধতা, অদক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবন এবং জলবায়ু পরিবর্তন এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে। এছাড়াও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বাশার একটি সংবাদ প্রতিবেদনে বলেন, ডেঙ্গুর অন্তত অর্ধেক ঘটনার পেছনে দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ-অনিয়মিত পানি সরবরাহের কারণে মানুষ বাসাবাড়িতে যে পানি জমিয়ে রাখেন, সেখান থেকেই মশার প্রজনন শুরু হয়।
১.৬ সবুজ ও উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হাফিজুর রহমান এবং গবেষক মাহফুজুল ইসলামের (২০২২) গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (DSCC) মোট ৯৯.২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাত্র ৭.৯৯% ঘন সবুজ এলাকা (Dense Green Space) বিদ্যমান, যা একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য অনেক কম। তুলনামূলকভাবে ঢাকায় সবুজ স্থানের অপ্রতুলতা আরও প্রকট। এছাড়াও, বর্তমান সময়ে বহুল আলোচিত ঢাকার কারওয়ান বাজার মেট্রোস্টেশনের পাশের পান্থকুঞ্জ এবং ফার্মগেট মেট্রোস্টেশন-সংলগ্ন শহীদ আনোয়ারা উদ্যানগুলো দখলমুক্ত করা হলেও, এখনো সেগুলো সবুজের সজীব ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত।
২. যানজট ও যানবাহনের নির্গমন
২০১৭ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, গত এক দশকে ঢাকার যানবাহনের গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ কিলোমিটারে, আর এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা নেমে আসতে পারে হাঁটার গতির চেয়েও কম, ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটারে। বিশ্বব্যাংকের প্রোগ্রাম লিডার ও জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞ রাজেশ রোহাতগি বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের ‘টুওয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা’ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে যানজটের কারণে। আরেকটি গবেষণায়, বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) বলছে, যানজটে ঢাকায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা- দুটি পূর্ণাঙ্গ মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হয়।
৩. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা
৩.১ অপরিকল্পিত নগরায়ণ
অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনার ভূমি ব্যবহার অনুমোদন ছাড়াই ঢাকায় শিল্পকারখানা ও গার্মেন্টস সহ অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে শিল্পবর্জ্য, বায়ু নির্গমন ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ তৈরি হয়েছে শহরের কেন্দ্রে। রাজউকের বিদ্যমান বিশধ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনীতে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো এলাকায় শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থানান্তরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেন মতিঝিল ও গুলশানের মতো কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোর ওপর চাপ কমানো যায়। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সংশোধনীর আওতায় ঢাকাকে ৬৮টি ব্লকে পুনর্বিন্যস্ত করা হচ্ছে, যাট্রানজিট-নির্ভর উন্নয়ন ও ব্লক-ভিত্তিক পরিকল্পনাকে সহজতর করবে।
৩.২ ভূমি ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর আদমশুমারি ২০২২ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ২০১১ সালের ১৪ কোটি ৪০ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৫২ লাখে, যেখানে নগর জনসংখ্যা ৫ কোটি ২০ লাখ এবং গ্রামীণ জনসংখ্যা ১১ কোটি ৩১ লাখ। সবচেয়ে জনবহুল বিভাগ হিসেবে ঢাকা বিভাগে বাস করছে ৪ কোটি ৪৪ লাখ মানুষ, যা জাতীয় জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। এই দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের চাপে বাসস্থান, শিল্প, বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে জমির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, ফলে কৃষিজমি ও জলাভূমি ক্রমশ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে রূপান্তরিত হচ্ছে। বিশেষত ঢাকা মহানগর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় এই রূপান্তরের হার সবচেয়ে বেশি, যা পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলছে।
৩.৩ ঝুঁকিপূর্ণ ভূমি ব্যবহার
পুরান ঢাকার সংকীর্ণ অলিগলিতে আবাসিক ভবনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে হাজারো দাহ্য কেমিক্যাল গুদাম। লুকিয়ে থাকা এসব রাসায়নিক গুদাম যেন একেকটি বোমা। একটি সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গুদাম আছে, যার মধ্যে ১৫ হাজারই অবস্থিত আবাসিক ভবনের ভেতরে, অথচ সিটি করপোরেশনের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স আছে মাত্র আড়াই হাজারটির। এছাড়াও, ২০১০ সালে নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন এবং ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টায় ৭১ জন প্রাণ হারানোর পরও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হয়নি-২০২৫ সালের অক্টোবরে মিরপুরে আরেকটি কেমিক্যাল গুদামে আগুনে প্রাণ হারান আরও অন্তত ১৬ জন, আর কেরানীগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রস্তাবিত রাসায়নিক পল্লি প্রকল্প এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।
৪. কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা
বাংলাদেশের নগরায়ণ যে গতিতে এগোচ্ছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি। ২০২১ সালে প্রাকাশিত ওয়েস্ট কনসার্নের একটি জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নগর এলাকায় দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন ৬,৪৯৩ টন থেকে বেড়ে ২৩,৬৮৮ টনে পৌঁছেছে। এবং ২০৪১ সালের মধ্যে তা ১,৪২,৩২২ টনে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। যা দুই সিটি কর্পোরেশন জনসংখ্যা বৃদ্ধির (২০২১-এ ৬.৫ কোটি, ২০৪১-এ ১১.৯ কোটি প্রক্ষেপিত) সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বলে জানান। এছাড়াও, Scientific Reports (Nature জার্নাল)-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি) এলাকায় ২০২০ সালে দৈনিক মোট বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে প্রায় ৬,৪৬৫ টন, যার মধ্যে মাত্র ৪,৭০০ টন ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১,৭৬৫ টন (মোট উৎপাদনের প্রায় ২৭%) বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে। যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাস্তায়, ড্রেনে বা খোলা জায়গায় পড়ে থাকছে, যা মশার প্রজনন ও জলাবদ্ধতা উভয় সমস্যাকেই বাড়িয়ে তুলছে।
৫. সামাজিক নিরাপত্তার সমস্যা
৫.১ নারী, প্রবীণ ও শিশুবান্ধব নগর পরিবেশের অভাব
বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের গবেষকদের পরিচালিত এক জরিপে অংশ নেওয়া নারী উত্তরদাতাদের ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ঢাকার গণপরিবহনে হয়রানির শঙ্কায় ভোগেন, আর ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক মূল্যায়ন দিয়েছেন। শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে ঢাকায়, কারণ প্রতিটি খালি জমিই রূপান্তরিত হচ্ছে আবাসিক বা বাণিজ্যিক স্থাপনায়। সায়েন্সডাইরেক্ট জার্নালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্যই শহুরে গণপরিবহন ব্যবস্থা যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, যা তাদের স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক যোগাযোগে প্রবেশাধিকার সীমিত করে ফেলছে। এর প্রতিকার হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘বয়স-বান্ধব শহর’ কাঠামো অনুসরণ করে অগ্রাধিকার আসনের কার্যকর প্রয়োগ, ফুটপাতে র্যাম্প নিশ্চিতকরণ এবং প্রবীণদের জন্য নিরাপদ পথচারী সংকেত ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
৫.২ ভিন্নভাবে সক্ষম (Physically Challenged) বান্ধব অবকাঠামোর ঘাটতি
একটি সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেট্রোরেলে এলিভেটর, টাইলভিত্তিক নির্দেশনা ও সহায়ক টয়লেটের মতো সুবিধা থাকলেও শহরের বাস ও ফুটপাতের সিংহভাগ এখনও ভিন্নভাবে সক্ষম (Physically Challenged) ব্যক্তিদের জন্য কার্যত অগম্য। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের গণপরিবহন এখনও ভিন্নভাবে সক্ষম (Physically Challenged) ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী নয়-সড়ক, রেল বা নৌপথ, কোনো ব্যবস্থাই তাঁদের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নকশা করা হয়নি। সুতরাং পুরো পরিবহন বহর ঢেলে সাজানোর বদলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য নির্দিষ্ট বিরতিতে চলাচলকারী পৃথক শাটল সেবা চালুর মতো লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ তুলনামূলক দ্রুত ফল দিতে পারে।
বিআইপি'র মতামতঃ
ঢাকার বাসযোগ্যতা সংকট কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি বহু আন্তঃসম্পর্কিত ব্যর্থতার এক জটিল সমষ্টি, যার মূলে রয়েছে পরিকল্পনাহীন ও খণ্ডিত সিদ্ধান্তগ্রহণ। পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, পরিবহন কিংবা সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই মূল প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়: সমাধানগুলো এসেছে প্রকল্পভিত্তিক ও তাৎক্ষণিকভাবে, কোনো সামগ্রিক কাঠামোর অধীনে নয়। পরিবেশ ও নির্মাণখাতে প্রচলিত ইটের বদলে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহারকে সরকারি অগ্রাধিকার দেওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা ইটভাটাজনিত বায়ুদূষণ কমানোর পাশাপাশি কৃষিজমি ও মাটির ক্ষয়ও রোধ করবে। তবে এই একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয় তাই নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ ও যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণকেও আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপ দিতে হবে। একইভাবে, শব্দদূষণ ও দৃশ্যদূষণ মূলত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার (Land Use Zoning) অনুপস্থিতিরই ফল, যেখানে বিজ্ঞাপন জোন নির্ধারণ ও ডিজিটাল বিলবোর্ড নিবন্ধন কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তবে তার সাফল্য নির্ভর করে সিটি করপোরেশনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের ওপর। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে নিছক স্বাস্থ্যখাতের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সরাসরি যুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ও বিল্ডিং কোডের সাথে। তাই মশক-প্রতিরোধী নকশাকে জাতীয় বিল্ডিং কোডে অন্তর্ভুক্ত করাই একটি কাঠামোগত ও টেকসই সমাধান। যা বারবার প্রকল্পভিত্তিক হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি ফলপ্রসূ। পরিবহন খাতে যানজটকে অবকাঠামোর ঘাটতি হিসেবে না দেখে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা হিসেবে চিহ্নিত করাটাই মূল প্রশ্ন। বাস রুট যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা (অর্থাৎ, একই রুটে একাধিক কোম্পানির অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমিয়ে শহরের সব এলাকায় সুষম বাস সেবা নিশ্চিত করা), মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং হাঁটা ও সাইকেল-বান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া, অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা (Inclusive Planning) এখনো ঢাকার পরিকল্পনায় তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। নারী, শিশু, প্রবীণ ও ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের চাহিদাকে পরিকল্পনার মূল বিবেচনায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে বেশি খরচ ছাড়াই কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়—যেমন রাস্তায় সবসময় মানুষের উপস্থিতি থাকে এমনভাবে নিরাপদ রাস্তা তৈরি করা ("Eyes on the street" নীতি), প্রতিটি ওয়ার্ডে শিশুদের জন্য খেলার জায়গা রাখা, এবং প্রয়োজনমতো নির্দিষ্ট রুটে শাটল সেবা চালু করা। এই ধরনের সহজ কিন্তু কার্যকর উদ্যোগগুলোকে এখন অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। তাই সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এই সবগুলো সমস্যার উৎস অভিন্ন প্রকল্পভিত্তিক, বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তগ্রহণ। ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, পরিবেশ, আবাসন ও জনসেবাকে একটি অভিন্ন, দীর্ঘমেয়াদি স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামোর অধীনে না আনা পর্যন্ত পৃথক পৃথক সমাধান কেবল উপসর্গ প্রশমন করবে, প্রকৃত রোগমুক্তি নয়।
বিআইপি'র সুপারিশসমূহঃ
১। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন, চলমান পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
২। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিস্বার্থে অনুমোদিত পরিকল্পনার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে না।
৩। মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন রেখে প্রতি পাঁচ বছর পরপর পরিকল্পনাবিদ, বিশেষজ্ঞ, সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনার অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করতে হবে।
৪। খণ্ডিত এলাকাভিত্তিক, একক খাতভিত্তিক বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, পরিবেশ, আবাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে একীভূত করে সমন্বিত জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
৫। সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত না করে জলাভূমি, কৃষিজমি, জলাধার বা অন্যান্য পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না।
৬। যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার সঙ্গে তার সামঞ্জস্যতা যাচাই করে একটি সংক্ষিপ্ত 'পরিকল্পনা সামঞ্জস্যতা প্রতিবেদন' (Planning Compliance Report) বাধ্যতামূলকভাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৭। উন্নয়ন কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আগামী কয়েক দশকের নগর ও আঞ্চলিক চাহিদা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।