Tuesday, July 28, 2026

গণভোট: বৈধতার ভিত্তি জনগণ না সংবিধান?


আবাসন নিউজ ডেস্ক : গণভোটের রায় উপেক্ষা করা গণঅভ্যুত্থানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। জাতীয় সমঝোতার সুযোগ এখনো আছে। — রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের আলোচনা সভায় বক্তারা। 
ঢাকা, ৯ মে ২০২৬: জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের উদ্যোগে “গণভোট: বৈধতার ভিত্তি জনগণ না সংবিধান?” শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা রাষ্ট্রের বৈধতার সংকট, সাংবিধানিক শূন্যতা এবং গণভোটে প্রতিফলিত জনগণের প্রত্যক্ষ ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সরকারি প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সভার মূল প্রবন্ধে গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বে ‘Constituent Power’ বা উৎপাদক ক্ষমতা হলো জনগণের সেই প্রাথমিক ও সার্বভৌম ক্ষমতা, যা রাষ্ট্র ও সংবিধান সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র যখন গণভোটের রায়কে ‘ঘটনাক্রমে সিদ্ধ’ বলে আবার আদালতের ‘বিচারাধীন’ হিসেবে ঝুলিয়ে রাখে; তখন রাষ্ট্র নিজের জন্ম-উৎসকেই অস্বীকার করে। এই দ্বৈততা ও নৈতিক পলায়নপরতা রাষ্ট্রকে এক গভীর ‘লেজিটিমেসি ক্রাইসিস’ বা বৈধতার সংকটে নিমজ্জিত করছে।

সভাপতির বক্তব্যে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, একাত্তরের পর সবচেয়ে বেশি মূল্য এবারের অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের জনগণকে দিতে হয়েছে। কিন্তু কেবল ৫ শতাংশ লুটেরাদের স্বার্থে এ আত্মত্যাগ ব্যর্থ হতে চলেছে। 

বিএনপি বলেছে গণভোটের ৪টা প্রশ্নের আধা প্রশ্নে তাদের আপত্তি, বাকী সাড়ে তিন প্রশ্নে আপত্তি নাই। তাহলে তাদের মানুষকে বুঝাতে হবে কেনো এই আধা প্রশ্নে তাদের আপত্তি? এই আধা প্রশ্নে জনগণের কী ক্ষতি হবে? যদি জনগণের ক্ষতি না থাকে, কেবল নিজেদের দলীয় বা ব্যক্তি ইগোর বিষয় হয়, তাহলে আমরা বলবো জনগণের স্বার্থে জাতীয় সমঝোতার সুযোগ এখনো আছে। তাদের উচিত অনেক দেরি হবার আগেই অবিলম্বে সে সুযোগ কাজে লাগানো।

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সংঘাতে নয়, সমন্বয়ে। জাতীয় সমঝোতার পথে দেশকে এগিয়ে নেবার দায়িত্ব সরকারের।

সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শরীফ ভুঁইয়া বলেন, জাতীয় ঐকমত্যে অস্পষ্টতা আছে, ঠিক। কিন্তু বড় সংকট হবে, সংবিধান সংশোধন আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। আদালতের দায়িত্ব সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। সে পথে মৌলিক কোন পরিবর্তন আদালত বাতিল করে দিতে পারে এবং বাধ্য থাকে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো গণপরিষদ। জনগণ সংবিধানেরও মালিক। কাজেই গণপরিষদই একমাত্র অভ্যুত্থানের স্পিরিট রক্ষা করতে পারে।

নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, গণভোট হলো ডাইরেক্ট ম্যান্ডেট। জনগণের ইচ্ছাকে আইনি কাঠামোয় রূপান্তর করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা, পুনর্বিচার বা স্থগিত করা নয়।

কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন দুই তৃতীয়াংশের ঐতিহাসিক ঝুঁকি আছে। আমাদের দেশে দুই তৃতীয়াংশ ম্যান্ডেট নিয়ে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, কারো শেষ পরিণতি ভালো ছিল না।

আমেরিকার সাথে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তিনি বলেন স্বাধীনতার পর ভারতের সাথে যে চুক্তি হয়েছিল, যেটাকে অনেকে গোলামীর চুক্তি বলে, এবারের বাংলাদেশ মার্কিন চুক্তি তার চেয়েও বেশি অধীনতামূলক।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হোসেন বলেন, ১৩ তম সংশোধনী ছাড়া আর কোন সংশোধনী জনগণের পক্ষের ছিলনা, কেবল শাসক শ্রেনীর জন্য যা দরকার ছিল, তাই করা হয়েছে। এবারো সংশোধনী হলে তার কোন ব্যতিক্রম হবার সম্ভাবনা দেখি না। বরং এখনো সময় আছে, জাতীয় সমঝোতা তৈরির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করা। অন্যথায় গৃহযুদ্ধের মতো ভয়ংকর পরিণতির আশংকা করে তিনি।

আলোচনা সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যান ফাউন্ডেশনের ডা. কামরুল হাসান চৌধুরী, রাষ্ট্রচিন্তক ও রাজনীতিবিদ মঞ্জুর কাদির, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের মাহবুবুল আলম চৌধুরী, সংগঠক মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, গণমুক্তি জোটের রশিদ মিয়া, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন বিজয়, অধিকারকর্মী জাকির হোসেন, শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের জহিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এ এ এম ফয়েজ হোসেন, রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট আদিলুর রহমান প্রমুখ। সভার সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।

Super Admin

Super Admin

Please Login to comment in the post!

you may also like